সীমান্তে সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি: নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ!

সীমান্তে আরাকান আর্মি: নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বাংলাদেশ!
মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। ছবি: নিউজনেস্ট ডেস্ক

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন কার্যত মগ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাখাইন পরিস্থিতি ঘিরে আলোচনা তীব্রতর হয়েছে।

বিশ্ব গণমাধ্যমে খবর পাওয়া গেছে, সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি যে কোনো সময় রাখাইনকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করতে পারে। এদিকে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশগুলোও আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, নতুন ভূরাজনৈতিক সংকট কি বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলবে?

২০০৯ সালে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মির সহায়তায় আরাকান আর্মি গঠিত হয়। তাদের উদ্দেশ্য একটি স্বাধীন আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠা। এরপর ২০১৫ সাল থেকে তারা সামরিক তৎপরতা শুরু করে এবং সম্প্রতি রাখাইন ও পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে। এদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ২৭০ কিলোমিটারের পুরোটাই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া এখন প্রায় স্থবির। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেছেন, “মগ সন্ত্রাসী আরাকান আর্মিই কার্যত রাখাইনের সরকার। ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত এবং জটিল হয়ে পড়েছে। এমনকি নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য ঢল নামার আশঙ্কা রয়েছে।”

ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেছেন, “রোহিঙ্গা সংকট জটিলতর হচ্ছে। কারণ রাখাইন এখন সন্ত্রাসী আরাকান আর্মির দখলে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সম্পর্ক নেই, ফলে প্রত্যাবাসন কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির।”

বাংলাদেশের জন্য আরাকান আর্মির সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ বড় নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠছে। মুনীরুজ্জামান বলেছেন, “সীমান্তে মানব, মাদক এবং অস্ত্র পাচারের আশঙ্কা বেড়েছে। এদিকে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আরাকান আর্মির যোগাযোগ গড়ে ওঠাও অস্বাভাবিক নয়।”

সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেছেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতি সীমান্ত রক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিদ্রোহী গোষ্ঠী থাকায় দেশের উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর উত্সাহিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।”কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন অপরিহার্য। তবে সরাসরি না হলেও ‘ব্যাক চ্যানেল’ বা গোপনীয় উপায়ে এটি করা যেতে পারে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব জসিম উদ্দিন বলেছেন, জাতীয় স্বার্থে যা প্রয়োজন, সেটাই করা হবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ জান্তা সরকারের কাছে ভুল বার্তা পাঠাতে পারে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি সমাধানের প্রস্তাবও এসেছে।

সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদীতে নৌযান চলাচল সীমিত করা হয়েছে। বিজিবি ও কোস্টগার্ডের টহলও জোরদার করা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন জানিয়েছেন, সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

মিয়ানমারের রাখাইন পরিস্থিতি বাংলাদেশকে নতুন কূটনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংকটে ফেলেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সন্ত্রাসী আরাকান আর্মির সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বাংলাদেশ সরকার কতটা কূটনৈতিক দক্ষতার সঙ্গে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারে।

আমাদের ফলো করুন