১৫ মাস ব্যাপী গাজা ও লেবাননের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধে বর্বর ইসরায়েলের সামরিক অভিযান কৌশলগতভাবে সফল মনে হলেও, দেশটি অভ্যন্তরীণ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। কসাই খ্যাত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সংঘাতকে তাদের বড় ধরনের বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তাদের দাবির বিপরীতে বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন।
অভ্যন্তরীণ সংকট
ইসরায়েলের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষের পর প্রায় ৬ লাখ ইহুদি দেশ ছেড়ে চলে গেছে। অ্যান্টি-জায়নিস্ট ইতিহাসবিদ ইলান পাপে জানান, ৭ লাখ ইসরায়েলি দেশ ত্যাগ করেছে, যদিও সরকারিভাবে এ তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এদিকে কানাডার অভিবাসন বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলি নাগরিকদের অস্থায়ী কর্ম ভিসার সংখ্যা পাঁচ গুণ বেড়ে ৮ হাজারে পৌঁছেছে। পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও ইসরায়েলিদের ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
দেশত্যাগের এই ধারা ইসরায়েলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর বড় ধাক্কা। ইসরায়েলি অভিবাসনকে সাধারণত ‘আলিয়া’ (উন্নয়ন বা পবিত্র যাত্রা) বলা হয়, আর দেশত্যাগকে ‘ইয়েরিদা’ (পতন বা পশ্চাৎপসরণ)। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নেতিবাচক অভিবাসন ইসরায়েলের আদর্শগত ভিত্তিকে দুর্বল করছে।
যুদ্ধের মানবিক ক্ষতি
৭ অক্টোবর হামাসের ‘তুফানুল আকসা’ অভিযানের প্রথম দিনে ১,১৬৩ জন নিহত এবং ১,৯৪১ জন আহত হয়। এদের মধ্যে বেশির ভাগই সেনা ও বেসামরিক নাগরিক।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গাজায় সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৮১৬ জন সেনা নিহত এবং ৫,৪৭৭ জন আহত হয়েছে। এদিকে লেবাননের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ১৩১ জন।
এছাড়া ইসরায়েলের পুনর্বাসন বিভাগের তথ্য বলছে, এক বছরের যুদ্ধে প্রায় ১৬ হাজার আহত সেনা চিকিৎসা নিয়েছে।সামরিক সরঞ্জামের সংকট মাআরিভ পত্রিকার সামরিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বর্তমানে অস্ত্র ও সরঞ্জামের সংকটে ভুগছে।
সামরিক দুর্বলতার প্রধান ক্ষেত্র:
১. যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার:অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বহর এবং এফ-১৫ যুদ্ধবিমানগুলোর কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।পাশাপাশি নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহেও বিলম্ব হচ্ছে।
২. অস্ত্র ও গোলাবারুদ: বোমা ও অন্যান্য গোলাবারুদের মজুদে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এদিকে যুদ্ধকালীন সময়ে অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে তাদের অস্ত্রগুলো দ্রুত অকেজো হয়ে পড়ছে।
বিশ্লেষক আভি আশকেনাজি বলেছেন, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর পুনর্গঠন এখন সময়ের দাবি। নতুন সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি
ইসরায়েলের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রধান হিসাবরক্ষক ইয়াহালি রোটেনবার্গ জানিয়েছেন, চলমান যুদ্ধে ব্যয়ের পরিমাণ ১০৬.২ বিলিয়ন শেকেল (২৯.১ বিলিয়ন ডলার)।
মূল ক্ষতির দিকগুলো
১. জাতীয় ঋণ বৃদ্ধি: ২০২২ সালের শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১.০৪ ট্রিলিয়ন শেকেল।২০২৪ সালে এসে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.২৫ ট্রিলিয়ন শেকেলে।
২. পর্যটন খাত: আন্তর্জাতিক পর্যটনে ক্ষতির পরিমাণ ১৮.৭ বিলিয়ন শেকেল (৫.২ বিলিয়ন ডলার)। এদিকে অভ্যন্তরীণ পর্যটনে ক্ষতি হয়েছে আরও ৭৫৬ মিলিয়ন শেকেল (২১০ মিলিয়ন ডলার)।
৩. পরিবেশগত ক্ষতি: উত্তরাঞ্চল ও গোলান মালভূমিতে প্রায় ৫৫ হাজার একর বনভূমি ধ্বংস হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরতা ও অস্ত্র সংকট যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র কিছু ব্যবহৃত বিমান সরবরাহ করলেও তা প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। এদিকে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের দীর্ঘ গবেষণার উপর জোর দেওয়ার কারণে অস্ত্র ক্রয় প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
নেতিবাচক অভিবাসনে গবেষণা খাতে প্রভাব: গবেষক মোহাম্মদ আল বাহানসি বলেছেন, ইসরায়েল থেকে যারা অভিবাসন করছেন, তাদের বেশির ভাগই তরুণ বিজ্ঞানী বা গবেষক। নিরাপত্তার অভাব এবং সামরিক অস্থিরতা তাদের অন্য দেশে চলে যেতে বাধ্য করছে।
সূত্র: আল জাজিরা