রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ভারতের কঠোরতা, মুসলিমদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ভারতের কঠোরতা, মুসলিমদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেওয়ার সিদ্ধান্তে ভারতের কঠোরতা, মুসলিমদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। ছবি: মুসলিম মিরর

ভারত সরকারের সাম্প্রতিক অবস্থান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, তারা কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের শরণার্থী মর্যাদা দেবে না। বরং তাদের অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে বহিষ্কার করার নীতিতে অটল থাকবে।

সরকার বলছে, রোহিঙ্গাদের বসবাস ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তবে মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, এটি রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আরও বাড়িয়ে দেবে এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণেরই আরেকটি দৃষ্টান্ত।

ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) এবং জাতীয় নাগরিক তালিকা (NRC)-এর মতো নীতিগুলো মুসলিমদের অধিকার খর্ব করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় না দেওয়ার সিদ্ধান্তও একই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রোহিঙ্গারা মূলত মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হওয়া নির্যাতিত জনগোষ্ঠী। ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীর হাতে গণহত্যার শিকার হয়ে লাখো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এছাড়া সেখানকার কঠিন বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই ভারত, মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে পাড়ি জমায়।

কিন্তু ভারত সরকার বরাবরই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার বলেছে, ভারত ১৯৫১ সালের শরণার্থী সনদ বা ১৯৬৭ সালের প্রটোকলে স্বাক্ষর করেনি। তাই রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, বিষয়টি শুধুই রাজনৈতিক নয়, এটি মানবিকতাও।

ভারতে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য নতুন কিছু নয়। উত্তরপ্রদেশ, আসাম, দিল্লি বা কর্ণাটকের মতো রাজ্যগুলোতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। একদিকে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভেঙে ফেলা হচ্ছে, অন্যদিকে গরু রক্ষার নামে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। এখন রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নেওয়া এই কঠোর পদক্ষেপ সংখ্যালঘুদের আরও প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেবে।

এদিকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের আটক করে রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা এক আবেদনে বলা হয়েছিল, রোহিঙ্গারা কোনো অপরাধ ছাড়াই বছরের পর বছর বন্দি রয়েছেন। কিন্তু সরকার জানিয়ে দিয়েছে, তারা কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের মুক্তি দেবে না।

এতকিছুর মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক হলো— সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, রোহিঙ্গা শিশুদের সরকারি স্কুলে পড়তে বাধা দেওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে তারা কতটা নিরাপদে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। মুসলিমদের ওপর ক্রমাগত বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে অনেকেই উদ্বিগ্ন যে, আদালতের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে কিনা।

ভারত সরকার দাবি করছে, দেশটির সীমিত সম্পদ এবং বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপে তারা রোহিঙ্গাদের জায়গা দিতে পারবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কি আসলেই কেবল সম্পদের সংকট, নাকি ধর্মীয় পরিচয়ের কারণেই রোহিঙ্গাদের প্রতি এত কঠোরতা?

বিশ্বের অন্যান্য দেশ যখন শরণার্থীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, তখন ভারত ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি এমন বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়।

ভারতের মুসলিমরা ইতোমধ্যেই বৈষম্য, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বিদ্বেষের শিকার। এখন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপ মুসলিমদের প্রতি সরকারের কঠোর মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ।

আমাদের ফলো করুন