বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র নিয়ে তীব্র মতবিরোধের জেরে পিছিয়ে গেছে ছাত্রদের কর্মসূচি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের বিরোধের কারণে এ ঘোষণা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
মতবিরোধের সূচনা
ছাত্রদের পক্ষ থেকে এককভাবে ঘোষণাপত্র প্রণয়ন ও প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্ট জানান, জাতীয় ঐকমত্য ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এমনকি এমনটি হলে তিনি সরকারে থাকবেননা বলেও জানিয়ে দেন । পাশাপাশি উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্য সদস্যদের মধ্যেও এ বিষয়ে ভিন্নমত দেখা যায়। আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল সরাসরি ঘোষণাপত্রের বিরোধিতা করেন।
এদিকে, ছাত্রউপদেষ্টা মাহফুজ আলম, নাহিদ ইসলাম এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পদত্যাগের সম্ভাবনা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়। বিএনপি এবং অন্যান্য দল মনে করে, জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র প্রণয়ন না করলে এতে বিভাজনের আশঙ্কা রয়েছে।
গভীর রাতে আলোচনা
সোমবার গভীর রাতে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সরকার, রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর দফায় দফায় বৈঠক হয়। লন্ডন থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও আলোচনা করেন ছাত্রনেতারা। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হবে এবং সুবিধাজনক সময়ে তা ঘোষণা করা হবে।
কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা
রাতে রাজধানীর বাংলামোটরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আপাতত ঘোষণাপত্র প্রকাশ স্থগিত রাখা হবে। তবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘মার্চ ফর ইউনিটি’ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।
বৈঠকে ক্ষুব্ধ একটি অংশ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা মনে করে, পূর্বের মতোই এ ধরনের সিদ্ধান্ত আন্দোলনকে দুর্বল করে তুলতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র জানানোর সিদ্ধান্তই গৃহীত হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে ছাত্রদের একক ঘোষণার সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটি মনে করে, এ ধরনের একক পদক্ষেপ রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবির এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেয়নি।
ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি
৩১ ডিসেম্বর ঘোষণাপত্র প্রকাশের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা স্থগিত করা হয়েছে। নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার যদি সকল পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র তৈরি ও প্রকাশ করে, তাহলে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে।
নেতারা মনে করছেন, ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকারের এমন উদ্যোগ আন্দোলনের একটি বড় বিজয়। তবে ঘোষণাপত্রের চূড়ান্ত রূপ কেমন হবে, তা নিয়ে আগ্রহ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।মোটকথা,জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ঘোষণাপত্র প্রণয়নের দাবি মেনে নেওয়াকে আপাতত বিজয় হিসেবে দেখছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পথচলা কতটা সফল হয়, তা নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।







