মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অবনতি: রুশ লেখকের বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অবনতি: রুশ লেখকের বিশ্লেষণ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অবনতি: রুশ লেখকের বিশ্লেষণ। ছবি: আল জাজিরা

রুশ লেখক সেরগাই লিবিদিফ সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের ভেতরগত অবস্থা ও বিশ্বে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাজ্যের প্রভাব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। প্রতিবেদনে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হল তার রাজনৈতিক নীতির অসঙ্গতি।

যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে উদারপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করলেও ইসরায়েলের প্রতি একতরফা সমর্থন প্রদানের কারণে তারা এই নীতি অক্ষুণ্ন রাখতে পারছে না। এছাড়া আরব বসন্ত এবং গণতন্ত্রের প্রচারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের উপস্থিতি কমানোর ঘোষণা, যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের এক বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

লিবিদিফ আরও বলেন, ২০২৪ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়ার কারণে। তিনি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলগুলোতে অনেক পরিবর্তন ঘটছে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের কিছু অপ্রত্যাশিত নীতি নির্ধারণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

লিবিদিফের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে যে উদারপন্থী নীতির দাবি করা হয়, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীত। ইসরায়েলের প্রতি একপেশে সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে উদাসীনতা এই বৈপরীত্যের প্রধান দৃষ্টান্ত।

আরব বসন্তের সময়, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অঞ্চলগুলোর বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়ে তাদের পুরোনো মিত্রদের, যেমন মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক এবং তিউনিসিয়ার জাইনুল আবিদিন বিন আলিকে পরিত্যাগ করেছিল। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোর মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি অনেক রাজনীতিবিদ এই ঘটনাকে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ বলে মনে করেছিলেন।

লিবিদিফ আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্তও বিভিন্ন দেশকে সন্দেহের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, তাদের সেনা উপস্থিতি কমিয়ে পেছন থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তারা অঞ্চলটিকে পরিচালনা করবে। যা বাইডেন প্রশাসনও অনুসরণ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার প্রভাব যে তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে তা অনেকটাই স্পষ্ট।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময়ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য কৌশল নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আব্রাহাম চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করাসহ ‘আরব ন্যাটো’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে এই প্রকল্পটি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল, বাস্তবে তার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এই সময় ট্রাম্প বারবার প্যাট্রিয়ট এবং থাড বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলে।

লিবিদিফ মনে করেন, কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলের প্রতি একতরফা সমর্থন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তিনি উদাহরণস্বরূপ ইসরায়েলি লবির প্রভাবের কথা উল্লেখ করেন, যা আমেরিকান রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। গত ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ এর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ২২ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। যদিও আমেরিকান জনগণ এই সহায়তা দেওয়ায় সরকারের উপর ক্ষুব্ধ।

লেখক বলেন, ইসরায়েল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর শান্তি উদ্যোগের বিরোধিতা এবং গাজায় ‘জাতিগত নিধন’ প্রক্রিয়া চালানোর কারণে।

পরিশেষে লিবিদিফ মন্তব্য করেন, এসব কারণই মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে কমিয়ে এনেছে। পাশাপাশি রাশিয়া এবং চীনের মতো অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে। কেননা তাদের কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার করতে সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে ।

আমাদের ফলো করুন