সিরিয়ার একসময়ের সমৃদ্ধ তেলক্ষেত্র এখন ধ্বংসের পথে

সিরিয়ার একসময়ের সমৃদ্ধ তেলক্ষেত্র এখন ধ্বংসের পথে
সিরিয়ার একসময়ের সমৃদ্ধ তেলক্ষেত্র এখন ধ্বংসের পথে। ছবি: সংগৃহীত

সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে তেলখাত ছিল দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি তেল রপ্তানির মাধ্যমে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। তবে ২০১১ সালে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান আরব পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ অর্গানাইজেশন (ওপেক)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে সিরিয়া প্রতিদিন ৩ লাখ ৮৫ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৮ হাজার ব্যারেল স্থানীয়ভাবে পরিশোধন করা হতো এবং বাকিটা রপ্তানি করে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার আয় হতো।

অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. আবদুল মোনিম হালাবি বলেন, ‘যুদ্ধের আগে সিরিয়া প্রতিদিন ৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। ২০১২ সালের পর তা কমে ১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। তখন দেশটির দৈনিক চাহিদা ছিল ২ লাখ ব্যারেল। ইরানের সহায়তায় ঘাটতি পূরণ করা হলেও ২০১৭ সালের পর তা কমে আসে। এরপর ইরাক থেকে সীমিত পরিমাণে তেল আমদানি শুরু হয়।’

তেলক্ষেত্রের ভৌগোলিক বণ্টন ও সংকট

সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো মূলত ইউফ্রেটিস নদীর দুই পাশে অবস্থিত। পূর্ব ইউফ্রেটিসে দেইর আজ জোর প্রদেশে আল ওমর, কুনোকো এবং তানাকের মতো বৃহৎ তেলক্ষেত্র রয়েছে। আল ওমর তেলক্ষেত্র একসময় প্রতিদিন ৮০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করত।

পশ্চিম ইউফ্রেটিসে তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল তেলক্ষেত্র রয়েছে, যেমন আত তাইম এবং আশ শোলা। হাসাকা প্রদেশে রুমাইলান ও জাবসা তেলক্ষেত্র একসময় প্রতিদিন ২ লাখ ১০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করত। তবে যুদ্ধের কারণে এসব ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দেইর আজ জোরে তেলক্ষেত্র পরিচালনায় নিয়োজিত প্রকৌশলী রাদ সাদুন বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে পাইপলাইনের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে তেল পরিবহনে ট্যাংকারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’

পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে সিরিয়ার তেলক্ষেত্র পুনর্গঠনে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করা যাচ্ছে না। প্রকৌশলী মুস্তাফা তহা জানান, ‘দেইর আজ জোরের খারাতা তেলক্ষেত্রের ২৯টি কূপের মধ্যে মাত্র ৫টি সচল রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।’

অর্থনীতিবিদ ড. ওসামা কাজি মনে করেন, ‘আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে সিরিয়ার তেল উৎপাদন ৫ লাখ ব্যারেলে উন্নীত হতে পারে। এর অর্ধেক দেশীয় চাহিদা মেটাতে এবং বাকিটা রপ্তানিতে ব্যবহার করা যাবে।’

বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহমেদ বলেন, ‘তেলখাত পুনর্গঠনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। অবকাঠামো নির্মাণ এবং দক্ষ জনবল ফিরিয়ে আনাও গুরুত্বপূর্ণ।’

উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা

তেলখাত পুনর্গঠনে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। দেইর আজ জোরে তেলক্ষেত্র ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত মুসআব হাজার জানান, ‘তেল সম্পদকে জনগণের চাহিদা মেটাতে এবং উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধপরবর্তী সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠনে তেলের রাজস্বকে টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে।’

আমাদের ফলো করুন