এশিয়ার ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে ভারত ও চীনের সীমান্ত সংঘাত। দীর্ঘ ৩৫০০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এ সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের বিরোধ শতাব্দীপ্রাচীন। সামরিক সংঘর্ষ থেকে কূটনৈতিক টানাপোড়েন, দুই দেশের সম্পর্ক বরাবরই এই ইস্যুতে তিক্ত।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই সংঘাত?
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশরা ভারতের উত্তরাঞ্চলে ‘ম্যাকমোহন লাইন’ নামে একটি সীমারেখা নির্ধারণ করে। ১৯১৪ সালের শিমলা চুক্তির মাধ্যমে এই লাইন চিহ্নিত হলেও তৎকালীন চীনা সরকার এতে স্বাক্ষর করেনি। চীন এটিকে উপনিবেশিক চক্রান্ত হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে এবং আইনি বৈধতা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর এবং চীনে ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের প্রতিষ্ঠার পর এই বিরোধ আরও তীব্র হয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এই সীমারেখাকে ভারতের বৈধ সীমান্ত বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, চীন বরাবরই এটি অস্বীকার করে আসছে।
অঞ্চলগুলোর কৌশলগত গুরুত্ব
এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রে রয়েছে কাশ্মীর। অঞ্চলটি ভারত, চীন ও পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও পাকিস্তান কাশ্মীরকে ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস করার কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। অন্যদিকে, ভারত এই অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে চীন ও পাকিস্তানকে কৌশলগতভাবে প্রতিহত করতে চায়।
কাশ্মীরের একটি অংশ হলো অক্সাই চিন, যেটি দীর্ঘদিন ধরে জনবসতিহীন ও প্রায় অবহেলিত ছিল। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে চীন এখানে একটি সড়ক নির্মাণ করলে উত্তেজনা চরমে ওঠে। এরপর এনিয়ে ১৯৬২ সালে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয়।
এছাড়া, পূর্ব হিমালয়ের অরুণাচল প্রদেশ নিয়েও বিরোধ রয়েছে। ভারত এটিকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করলেও চীন একে দক্ষিণ তিব্বতের অংশ বলে উল্লেখ করে।
১৯৬২ সালের যুদ্ধ
১৯৬২ সালে আকসাই চীন ও অরুণাচল প্রদেশে চীনের সামরিক অভিযান ভারতকে চীনের বিপক্ষে প্রস্তুতি নিতে বাধ্য করে। আকসাই চীন অঞ্চল চীনের নিয়ন্ত্রণে গেলেও কোনো রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। বরং সীমান্তে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
এর জেরে ভারত সীমান্তে সামরিক শক্তি বাড়াতে থাকে। বিমানবাহী রণতরী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রের মতো সামরিক সক্ষমতা গড়ে তোলে ভারত। ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানান, ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের একটি কারণ ছিল চীনের আগ্রাসন।
গালওয়ান সংঘর্ষ ও মানচিত্র বিতর্ক
২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষ আবারও উত্তেজনার মাত্রা বাড়ায়। এই সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। এর পরপরই সীমান্তে সেনা মোতায়েন বাড়ায় দুই দেশ।
২০২৩ সালে চীনের প্রকাশিত মানচিত্রে ভারতীয় অঞ্চলকে নিজেদের দাবি করা হয়। এতে ভারত তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, চীন এই মানচিত্র প্রকাশ করে কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ করছে।
লাদাখে উত্তেজনা ও যুদ্ধের শঙ্কা
লাদাখ অঞ্চলে দুই দেশের সেনাদের বিপজ্জনক অবস্থান নিয়ে ভারত ২০২৩ সালে সতর্কতা জানায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামানিয়াম জয়শঙ্কর বলেন, সীমান্তে সেনারা কাছাকাছি অবস্থান করায় পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক হতে পারে।
তিনি জানান, ২০২০ সালে হওয়া চুক্তি অনুসারে চীন সীমান্ত বিরোধ মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বাণিজ্য ও ভূরাজনীতি
ভারত ও চীনের বিরোধ শুধু ভৌগোলিক নয়; এটি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, কিন্তু ভারত পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে চীনের উদ্যোগকে এড়িয়ে চলতে চায়।
বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতেও দুই দেশের বিরোধ স্পষ্ট। কয়েক ‘শ’ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য থাকা সত্ত্বেও সীমান্তে উত্তেজনা এই সম্পর্ককে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারতকে সমর্থন দিচ্ছে। পাশাপাশি কোয়াড জোটের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
অন্যদিকে, রাশিয়া ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেও চীনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বেশি। পাকিস্তানও চীনকে সমর্থন করছে এবং চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর প্রকল্পে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
সমাধানের পথে সম্ভাব্য বাধা
দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা স্থায়ী সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন সীমান্তে সেনা সমাবেশ বাড়তে থাকায় ভবিষ্যৎ সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ছে।
তবে যুদ্ধের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনায় উভয় দেশ কূটনৈতিক সমাধানে যেতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি যে সহজে স্বাভাবিক হবে না, তা স্পষ্ট।
ভারত ও চীনের এই সংঘাত শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা







