একটি দেশের সিনেমা কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি জনমত গঠনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু বলিউড ও ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে বরাবরই এক নতুন প্রবণতা চোখে পড়ে—ইসলামবিদ্বেষী প্রোপাগান্ডার প্রচার।
এরই মধ্যে ২০২৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত তিনটি চলচ্চিত্র—‘আল-মুলহিদ’, ‘হামারে বারাহ’ ও ‘আমরান’—নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই চলচ্চিত্রগুলো পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে, তাদের ধর্মকে হিংস্রতা ও উগ্রতার সঙ্গে যুক্ত করছে। পাশাপাশি সমাজে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে।
যেকোনো বিতর্কিত সিনেমার নির্মাতারা সবসময় একটাই যুক্তি দেন—‘এটি সৃজনশীল স্বাধীনতা’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বাধীনতা কি বিদ্বেষ ছড়ানোর লাইসেন্স হতে পারে?
‘আল-মুলহিদ’, ‘হামারে বারাহ’ ও ‘আমরান’—এই তিনটি ছবির গল্পই ঘুরেফিরে মুসলমানদের জঙ্গিবাদ, সহিংসতা ও জাতিগত বৈষম্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরণের কন্টেন্ট পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়, যাতে সমাজে ইসলামফোবিয়া আরও গভীরভাবে প্রবেশ করে। এমনকি অনেক গবেষক এই প্রবণতাকে নাৎসি জার্মানির ইহুদিবিরোধী প্রোপাগান্ডার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক শামসুল ইসলাম বলছেন,‘নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের যেভাবে ‘দেশের শত্রু’ বানিয়ে দেখানো হয়েছিল, বর্তমানে ভারতীয় সিনেমায় মুসলমানদেরও সেইভাবেই উপস্থাপন করা হচ্ছে।’এই তিনটি সিনেমায় মুসলমানদের ‘অপর’ (others) হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা মুসলিমদেরকে তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার একটি কৌশল।
এদিকে ‘আল-মুলহিদ’ সিনেমার বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়ের ব্যাপক আপত্তির পর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। আদালত সিনেমাটির মুক্তি স্থগিত করে, কারণ এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে।
সমালোচকরা বলছেন, যদি কোনো সিনেমা একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করে বিদ্বেষ ছড়ায়, তাহলে সেটিকে কেবল ‘সৃজনশীল স্বাধীনতা’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না।
‘আমরান’ সিনেমাটি যখন মুক্তি পায়, তখন তামিলনাডুতে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, এই সিনেমায় ইসলামকে ‘সহিংস ধর্ম’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী ড. ফারাহ আনসারি বলেন,‘এই সিনেমাগুলো নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে মুসলমানদের প্রতি ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’
বহু গবেষক মনে করেন, ‘আল-মুলহিদ’, ‘হামারে বারাহ’ ও ‘আমরান’ একই ধরনের বিদ্বেষী বার্তা ছড়াচ্ছে, তবে ভিন্ন প্রসঙ্গে।Tandfonline-এর এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, এই তিনটি ছবির বর্ণনা ও কৌশল নাৎসি জার্মানির প্রোপাগান্ডার সঙ্গে ভয়ঙ্কর মিল রাখে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. আদিল খানের মতে,ইসলামবিদ্বেষী সিনেমাগুলো ঠিক সেভাবেই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়, যাতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা যায় এবং তাদের সমাজের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা যায়।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার অধ্যাপক আমির আনোয়ার বলেন,এই মুহূর্তে ভারতীয় মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো শিক্ষিত হওয়া, নিজেদের গল্পগুলো নিজেরাই বলা এবং সমাজের মূলধারায় নিজেদের জায়গা শক্ত করা।অনেক মুসলিম নির্মাতা এখন নিজেদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পাল্টা গল্প বলার চেষ্টা করছেন, যেখানে তারা মুসলমানদের সত্যিকারের চিত্র তুলে ধরছেন।
সিনেমা একটি শক্তিশালী মাধ্যম, যা মানুষের চিন্তা ও মনোভাব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই শক্তিকে যদি ঘৃণা ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সমালোচকরা বলছেন, বলিউডের এখন উচিত ‘প্রোপাগান্ডা সিনেমা’ তৈরি বন্ধ করা এবং প্রকৃত ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই, বৈচিত্র্যপূর্ণ কাহিনী তুলে ধরা।
সূত্র: মুসলিম মিরর







