উইঘুর মুসলিমদের রামাদানে রোজা না রাখতে বাধ্য করছে চীন

উইঘুর মুসলিমদের রামাদানে রোজা না রাখতে বাধ্য করছে চীন
উইঘুর মুসলিমদের রামাদানে রোজা না রাখতে বাধ্য করছে চীন। ছবি: আরএফএ

চীনের নিপীড়নমূলক নীতির শিকার উইঘুর মুসলিমগণ এবার রামাদানেও কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে পড়েছেন। দেশটির কর্তৃপক্ষ উইঘুরদের দিনে খাবার খাওয়ার ভিডিও পাঠাতে বাধ্য করছে, যেন তারা নিশ্চিত করতে পারে কেউ রোজা রাখছে না।

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুররা প্রতিদিনের খাবার খাওয়ার ভিডিও রেকর্ড করে পাঠানোর জন্য চাপের মুখে রয়েছেন। স্থানীয় পুলিশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য থেকে জানা গেছে, চীন সরকার এই নীতি বাধ্যতামূলক করেছে।

কাশগার অঞ্চলের পেইজিওয়াত কাউন্টির এক বাসিন্দা চীনা সামাজিক মাধ্যম দৌইনে (Douyin) জানিয়েছেন, তাকে প্রতিদিন দুপুরের খাবার খাওয়ার ভিডিও ধারণ করতে হচ্ছে এবং তা গ্রাম প্রশাসকের কাছে পাঠাতে হচ্ছে। ঈদুল ফিতর পর্যন্ত তাকে এই নিয়ম মানতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘যেখানেই যাই—বাজার, হাসপাতাল, যেকোন জায়গা—প্রতিদিন দুপুরে খাবার খাওয়ার ভিডিও করতে হয় এবং তা গ্রাম প্রশাসকের কাছে পাঠাতে হয়। এটা না করলে বড় ধরনের বিপদে পড়তে হতে পারে।’

রমজানে রোজা রাখা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। বিশ্বজুড়ে মুসলিমগণ স্বাধীনভাবে এটি পালন করেন। কিন্তু চীনে উইঘুর মুসলিমদের জন্য রোজা রাখা নিষিদ্ধ। দেশটির কর্তৃপক্ষ এটিকে ‘ধর্মীয় চরমপন্থা’ দমন করার অজুহাত হিসেবে উপস্থাপন করছে।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এটি উইঘুরদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার একটি বড় পরিকল্পনার অংশ। চীন সরকার শুধু রোজা রাখাই নিষিদ্ধ করেনি, বরং জুমার নামাজ পড়া, ঈদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উৎসব পালন, এমনকি মসজিদে যাওয়াও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, উইঘুরদের প্রতি চীনের দমন-পীড়ন কেবল ধর্মীয় স্বাধীনতা দমনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের জোরপূর্বক বন্দিশিবিরে আটকে রাখা, কঠোর শ্রমে নিয়োজিত করা এবং মাতৃভাষা নিষিদ্ধ করাসহ নানা উপায়ে সাংস্কৃতিক নিধন চালানো হচ্ছে।

পেইজিওয়াত কাউন্টির এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘এখানকার বাসিন্দাদের রোজা রাখার অনুমতি নেই, এমনকি উইঘুর পুলিশ সদস্যদেরও না। তাদেরও প্রতিদিন খাবার খাওয়ার ভিডিও পাঠাতে হচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, ’আমাদের এলাকায় এমন একটি সিস্টেম চালু করা হয়েছে, যেখানে বাসিন্দাদের প্রতিদিন ভিডিও প্রমাণ পাঠাতে হবে যে তারা রোজা রাখছে না।’

এই নিয়ম শুধু এক এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। গুলবাগ, বাইয়াওয়াত ও তেরিম শহরেও একই ধরনের নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি এই নির্দেশ দেননি, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন কঠোর নজরদারি রাখছে, যেন কেউ রোজা না রাখতে পারে। কিছু প্রশাসনিক কর্মকর্তা বাসিন্দাদের ফোন করে খাবার খাওয়ার প্রমাণ চাচ্ছেন, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় তারা রোজা রাখছে না।

এখানেই থেমে থাকেনি চীনের দমননীতি। রোজা রাখার গোপন চেষ্টা নস্যাৎ করতে সরকারিভাবে গণভোজের আয়োজন করা হচ্ছে দেশটিতে। পেইজিওয়াতের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘যারা গোপনে রোজা রাখার চেষ্টা করছে, তাদের নিরুৎসাহিত করতেই আমরা সম্মিলিত খাবারের আয়োজন করছি। এতে তারা বাধ্য হবে রোজা ভেঙে দিতে।’

চীনের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদেরও রোজা রাখতে দেওয়া হচ্ছে না। এটি নিয়ে আমাদের কাছে লিখিত নির্দেশনাও রয়েছে।

উল্লেখ্য, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি অনেক বছর ধরে উইঘুরদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে আসছে। মুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসরণ করা, এমনকি নিজেদের মুসলিম পরিচয় তুলে ধরাও চীনের চোখে অপরাধ।

বিশ্বের মুসলিমগণ যখন পবিত্র রামাদান মাসে ইবাদাতে মগ্ন, তখন উইঘুর মুসলিমদের রোজা রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাদের জোরপূর্বক নজরদারির মধ্যে রেখে ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। চীন সরকার তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, আর বিশ্ব নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

চীনের এই দমননীতি শুধু উইঘুর মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক নিধনের অংশ। মুসলিম পরিচয় নিশ্চিহ্ন করার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, যার শেষ কোথায় কেউ জানে না।

আমাদের ফলো করুন