২০২৪ সালে মিয়ানমারে জান্তা বাহিনীর ব্যর্থতার ফিরিস্তি

২০২৪ সালে মিয়ানমারে জান্তা বাহিনীর ব্যর্থতার ফিরিস্তি
২০২৪ সালে মিয়ানমারে জান্তা বাহিনীর ব্যর্থতার ফিরিস্তি। ছবি: রেডিও ফ্রি এশিয়া

২০২৪ সালে শান এবং রাখাইন রাজ্যে বড় ধরনের সামরিক ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জান্তা। এর ফলে তারা এখন দেশের অর্ধেকেরও কম এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই বছর জান্তা বাহিনী তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

শান রাজ্যে জান্তার পরাজয়

২০২৪ সালের জুন মাসে থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নামে পরিচিত জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো শান রাজ্যে আক্রমণ চালায়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) লাশিও শহর দখল করে।

শান রাজ্যে বিদ্রোহীরা ২৪টি টাউনশিপ নিয়ন্ত্রণ করছে। লাশিওর কাছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তরের পতন সামরিক জান্তার জন্য বড় ধরনের ক্ষতি। কেননা এই শহরটি ১ লাখ ৩০ হাজার জনসংখ্যার একটি বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং চীনের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত।

এছাড়া তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) শান রাজ্যের নওংখিও ও কিউকমি শহর এবং মান্ডালয়ের মোগোক রত্নখনি এলাকা দখল করে। জুলাই ও আগস্ট মাসে এই সাফল্যের ফলে শান রাজ্যের অধিকাংশ এলাকায় জান্তার নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যায়।

কুটকাই শহরের এক বাসিন্দা জানান, জান্তার প্রশাসন এখানে পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছে। অর্থনীতি এবং শিক্ষা খাত কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে।

রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি

রাখাইনে মগ সন্ত্রাসী আরাকান আর্মি ১৭টির মধ্যে ১৩টি টাউনশিপ দখল করেছে। এছাড়া সিত্তের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। কেবল কিয়াউকফিউ এবং মুনাউং টাউন জান্তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিয়াউকফিউতে চীনের সহযোগিতায় সেখানে সামরিক শক্তি বাড়ানো হচ্ছে।

এছাড়াও ২০২৪ সালে সন্ত্রাসী আরাকান আর্মির হামলায় রাখাইন রাজ্যের অ্যান টাউনশিপে জান্তার পশ্চিমাঞ্চলীয় সদর দপ্তর আগুনে পুড়ে যায়। এটি আরাকান আর্মির জন্য আরেকটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

চীন রাজ্য

চীন রাজ্যে বিদ্রোহীরা দুটি টাউনশিপ দখল করেছে। এ নিয়ে চীন রাজ্যের প্রায় ৮৫% অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে। চীন ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, এই অঞ্চলটিতে জান্তার নিয়ন্ত্রণ একদম ক্ষীণ।

বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণের বিস্তৃতি

সাগাইং, মাগওয়ে ও মান্দালয়ে বিদ্রোহীদের হামলা তীব্রতর হচ্ছে। যেই অঞ্চলগুলোতে জান্তার নিয়ন্ত্রণ কমে আসছে। এছাড়াও বিদ্রোহীরা কাচিন এবং কাইনের বড় অংশ দখল করেছে। এদিকে কাইয়া রাজ্যে প্রায় ৮০% অঞ্চল বিদ্রোহীদের দখলে। যে রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহীরা প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছে। পাশাপাশি প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তায় কাজ করছে।

নির্বাচন পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ

২০২৪ সালের এই পরাজয়ের মধ্যেও জান্তা সরকার ২০২৫ সালে একটি নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে। তবে বিরোধীদের দাবি, এই নির্বাচন হবে একটি প্রহসন এবং জান্তার শাসনকে বৈধতা দেওয়ার কৌশল।

নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান কো কো জানিয়েছেন, নির্বাচন ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে শুধুমাত্র জান্তার নিয়ন্ত্রণাধীন ১৬১টি টাউনশিপে অনুষ্ঠিত হবে।

জাতীয় ঐক্য সরকারের (এনইউজি) প্রেসিডেন্টের দপ্তরের মুখপাত্র কিয়াও জাও জানিয়েছেন, জান্তা প্রকৃতপক্ষে দেশের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এতে ইয়াঙ্গুন, মান্ডালয় এবং রাজধানী নেপিডো অন্তর্ভুক্ত।

ভবিষ্যত সংঘাত

২০২৫ সালে সাগাইংয়ে বড় আক্রমণের পরিকল্পনা রয়েছে। জান্তা জোরপূর্বক যুবকদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করছে। তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্থল ও আকাশপথে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

মিয়ানমারের সংঘাত পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবন আরও বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে।

আমাদের ফলো করুন