কেন রাশিয়া-ইউক্রেনের কারও ঝুলিতে পড়ছে না যুদ্ধের বিজয়?

কেন রাশিয়া-ইউক্রেনের কারও ঝুলিতে পড়ছে না যুদ্ধের বিজয়?
কেন রাশিয়া-ইউক্রেনের কারও ঝুলিতে পড়ছে না যুদ্ধের বিজয়? ছবি: আল জাজিরা

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কমান্ডার ভ্যালেরি জালুঝনিকে বরখাস্ত করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন স্থল বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল ওলেক্সান্ডার সিরস্কি।

তখন যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া শক্ত অবস্থানে ছিল। কৌশলগতভাবে তারা যুদ্ধের গতিপথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। এ অবস্থায় জালুঝনিকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত অনেকেই যৌক্তিক মনে করেছিলেন। কারণ, ২০২৩ সালে তিনি যুদ্ধের দিক পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হন বলে অভিযোগ ছিল। কেননা তিনি ২০২২ সালের শেষ দিকে খেরসন অঞ্চলে সামান্য সাফল্য ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু অর্জন করেননি।

তবে জালুঝনিকে সরানোর এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের জনগণ এবং সেনাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এরই মধ্যে নতুন কমান্ডার সিরস্কির দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই উদ্বেগ আরও তীব্র হয়। কারণ, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিক ক্ষতিকে বড় বিষয় হিসেবে দেখেন না। তার মতে, এটি যুদ্ধের স্বাভাবিক একটি বিষয়। বিপরীতে, জালুঝনি সেনাদের জীবন এবং তাদের পরিবারের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতেন। তিনি সবসময় সেনাদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।

জালুঝনি বনাম সিরস্কি

ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রধানত ভ্যালেরি জালুঝনিকে সরিয়ে দেওয়া হয় মূলত তার বাস্তববাদী মনোভাবের জন্য। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে নাটকীয়ভাবে এই যুদ্ধের গতিপথ বদলাতে পারবে না। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির থেকে ভিন্ন ছিল। জেলেনস্কি সবসময় জনগণের আশা উজ্জ্বল রাখতে এবং যুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনাকে সকলের সামনে তুলে ধরতে কাজ করেছেন।

জালুঝনি পশ্চিমাদের সমর্থন, পাল্টা আক্রমণের কৌশল এবং সৈন্যদের সংখ্যায়নে খুব সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তার মতে, ২০২৪ সালে ইউক্রেনের কৌশলগত প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু জেলেনস্কি দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে যুদ্ধের অচলাবস্থা ভাঙতে চেয়েছিলেন। এ কারণেই জেনারেল ওলেক্সান্ডার সিরস্কিকে নেতৃত্বে আনা হয়। কেননা তিনি প্রেসিডেন্টের পরিকল্পনা সম্পর্কে খুব ভালোভাবে জানতেন। পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে আরও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন।

এরপর সিরস্কির নেতৃত্বে ইউক্রেনীয় বাহিনী ২০২৪ সালের আগস্টে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে অভিযান চালায়। এটি ছিল ২০২২ সালের নভেম্বরের খেরসন মুক্তির পর সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্য। তবে এই অভিযান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কুরস্কে ইউক্রেনের ২৩ হাজারেরও বেশি সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন।

কুরস্ক অভিযান যদিও কৌশলগত সাফল্য এনেছে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নভেম্বর নাগাদ ইউক্রেন ওই অঞ্চলের ৪০ শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ হারায়। এই পরিস্থিতি জালুঝনির প্রতিরক্ষামূলক কৌশলকে আরও যৌক্তিক বলে মনে করায়।

রাশিয়ার অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ

২০২৪ সালে রাশিয়া পূর্ব ইউক্রেনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করে, যা ২০২৩ সালের স্থবিরতার অবসান ঘটায়। এর পাশাপাশি, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে, মস্কোও এক ধরনের বিজয় চায়, যা তাদের আন্তর্জাতিক মর্যাদা পুনর্গঠনে সহায়ক হবে।

যুদ্ধের তৃতীয় বছরে

২০২৪ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের ঘটনাগুলো তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
১. রাশিয়ার পূর্ব ইউক্রেনের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রগতি।
২. ইউক্রেনের সফল প্রতিরোধের মাধ্যমে রাশিয়ার কোরস্ক অঞ্চলে আক্রমণ।
৩. বছর শেষে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা আরো বৃদ্ধি পাওয়ার প্রভাব।

২০২৪ সালের শুরু থেকে রাশিয়া ডোনেৎস্ক অঞ্চলে সমন্বিতভাবে সেনা পাঠাতে থাকে। এদিকে ইউক্রেন বিভিন্ন এলাকায় তাদের প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনাগুলো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। পাশাপাশি দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ায় তাদের বাহিনী অবসন্ন হয়ে পড়ে। ফলে ইউক্রেন কুরস্ক অঞ্চলে আক্রমণ করে, যা রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ভারসাম্য অর্জনের চেষ্টা ছিল।

এদিকে ২০২৪ সালে যুদ্ধ প্রায় ৩,৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সম্মুখরেখার এক হাজার কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইউক্রেন রাশিয়ার অর্থনৈতিক কাঠামোকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ফলে ইউক্রেনের সেনারা রাশিয়ার পশ্চিম অংশে কিছু তেল শোধনাগার এবং কৃষ্ণ সাগরের রুশ নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি করে।

এদিকে মস্কো বোকরোভস্ক শহরটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য মনোযোগ দেয়। এটি ডোনেতস্কের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, যা রাশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক কেন্দ্র। কেননা এই শহরটি হাত ছাড়া হলে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল জুড়ে রাশিয়ার সরবরাহ লাইন ভেঙে যেতে পারে। তবে রাশিয়া কোরস্কতে সেনা পাঠানোর পরিবর্তে পূর্ব ইউক্রেনে তাদের অভিযান অব্যাহত রাখে। মার্কিন অনুমান অনুযায়ী ইউক্রেনের পক্ষ থেকে এতে প্রায় ১২,০০০ উত্তর কোরীয় সেনা পাঠানো হয় ।

এদিকে বোকরোভস্ক শহরের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানোর ফলে, অক্টোবর নাগাদ শহরের ৮০% অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়। তবে ইউক্রেনীয় সেনারা এখনও শহরটির প্রতিরক্ষা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। শহরটি এখন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের সবচেয়ে তীব্র সম্মুখরেখাগুলোর মধ্যে একটি। কেননা, সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি সরাসরি সংঘর্ষ ঘটে।

এছাড়া পূর্ব ইউক্রেনে অগ্রগতির জন্য রাশিয়াকে মানবিক ক্ষতিসহ ব্যাপক যান্ত্রিক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়। অক্টোবর মাসে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি ছিল সবচেয়ে বেশি। কেননা অক্টোবরে প্রায় ২০০টি ট্যাংক এবং ৬৫০টি সাঁজোয়া যানসহ প্রায় ৮০,০০০ সেনা নিহত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে রাশিয়ার ১২৫,০০০ জনেরও বেশি সেনা হতাহত হয়। তবে তারা ২,৭০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল ইউক্রেন থেকে দখল করে নেয়।

অপারেশন ‘কুরস্ক’

রাশিয়ার পূর্ব দিকে আক্রমণের বিপরীতে, কিয়েভ ২০২৪ সালে কৌশলগত ভারসাম্য অর্জন করার চেষ্টা করেছিল। এটি ছিল একটি প্রস্তুতি মাত্র, যাতে দুই পক্ষ শিগগিরই আলোচনায় বসতে পারে। এ লক্ষ্যেই কিয়েভ আগস্ট মাসে কুরস্ক অঞ্চলে আক্রমণ করে। কেননা তাদের মূল লক্ষ্য ছিল, রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলের আক্রমণ থেকে তাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর চেষ্টা করা। এভাবে তারা রাশিয়ার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে জমি বিনিময় নিয়ে আলোচনার সুযোগ পেতে চেয়েছিল। এতে আরেকটি লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনীয় বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করা।

তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কোরস্ক অঞ্চলে আক্রমণ করা একটি ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল । ফলে এটি কৌশলগতভাবে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এর মূল কারণ হলো, কিয়েভের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও কার্যকর বাহিনীকে কুরস্ক অঞ্চলে মোতায়েন করা। কেননা তখন পূর্ব ফ্রন্টে তাদের পরিস্থিতি আরো সংকটাপন্ন হয়ে উঠছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইউক্রেন কুরস্কে দখল করা ভূমির অধিকাংশই হারিয়েছে। নভেম্বর মাসে, তারা সর্বাধিক অগ্রগতি লাভের পরও প্রায় অর্ধেক অঞ্চল ফিরে পায়নি।

মার্কিন স্টিমসন কেন্দ্রের প্রধান গবেষক ইমা আশফোর্ড বলেন, ইউক্রেনীয় বাহিনী তাদের দখল করা এলাকা ধরে রাখতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। এই অভিযান, কেবল ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সরকারের জন্য একটি অস্থায়ী সাফল্য এনে দিয়েছে। এটি আরও নিশ্চিত করেছেন ইউক্রেনের সাবেক যোগাযোগ কৌশলগত প্রধান। তিনি বলেন, রাশিয়া কোরস্ক শহরের চারপাশে একটি শক্তিশালী ফাঁদ তৈরি করেছে। যেই ফাঁদে ফেলে ধীরে ধীরে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা পদ্ধতিকে ভেঙে ফেলছে।

২০২৪ সালে আমেরিকার পদক্ষেপ

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে শক্তিশালী করতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এই সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন।

২০২৪ সালের মে মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করতে সাহায্য করেছে। এর পাশাপাশি ইউক্রেনের সেনাদের মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে রাশিয়ার ভেতরে হামলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

প্রথমদিকে এই অনুমতি সীমিত ছিল। ইউক্রেনকে কেবল খারকিভ অঞ্চলের কাছাকাছি হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর ইউক্রেনকে রাশিয়ার যেকোনো স্থানে আক্রমণ চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়।

পাশাপাশি ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে শক্তিশালী অস্ত্র সরবরাহ করে। এর মধ্যে রয়েছে আমেরিকান এটাকমস, ফরাসি স্টর্ম শ্যাডো ও স্ক্যালপ। এসব ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার গভীরে আক্রমণ চালায়। এতে রাশিয়া ক্ষুব্ধ হয়ে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেয়।

যুদ্ধবিমান ও ন্যাটোর সমর্থন

এদিকে ন্যাটো ইউক্রেনকে ৬৫টি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইউক্রেনের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। রাশিয়ার মতো দেশের সাথে যুদ্ধ পরিচালনায় তাদের আরও যুদ্ধ বিমান প্রয়োজন।

সম্ভাব্য পথসমূহ

২০২৫ সালের প্রথম মাসগুলোতে ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হওয়ার জন্য একটি সম্ভাব্য পথ হল উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু করা। তবে এটি নির্ভর করবে প্রতিটি পক্ষের কতটা ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রয়েছে তার উপর। তবে ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন, তাহলে ধারণা করা হচ্ছে এক্ষেত্রে ইউক্রেন সবচেয়ে বেশি ছাড় দিতে পারে। কারণ, ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন, তিনি ইউক্রেন যুদ্ধে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ কমাতে চান।

এমনকি ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ক্রিমিয়া এবং ডনবাস অঞ্চল ত্যাগ করে শান্তি চুক্তি করার জন্য ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করাও হতে পারে, যাতে তারা স্বাক্ষর করে। যেই মন্তব্যটি মাদাগার প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান মার্চ মাসে করেছিলেন। যেখানে তিনি বলেন, ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করতে ইউক্রেনের জন্য সমস্ত মার্কিন সহায়তা প্রত্যাহারের হুমকি দেবেন।

২০২৫ সালের জন্য স্ট্র্যাটফোর গবেষণার বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত রাশিয়াকে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিতে পারে। পাশাপাশি ইউক্রেনকে আরও সামরিক সহায়তা দিতে পারে। আবার ইউক্রেনকে আর্থিক সহায়তা কমিয়ে চাপও দিতে পারে, যাতে উভয় পক্ষ আলোচনা শুরু করতে বাধ্য হয়।

এদিকে পশ্চিমা দেশগুলো ক্রমশ ইউক্রেনকে আলোচনায় যেতে চাপ দিচ্ছে। কেননা তারা বুঝে গেছে রাশিয়ার অগ্রগতি ঠেকাতে পশ্চিমা সহায়তা যথেষ্ট নয়। এমন বাস্তবতায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি কিছু রুশ শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তি সম্পাদনা করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের যুদ্ধকৌশল নিয়ে অভ্যন্তরীণ সমালোচনা এবং সেনাবাহিনীতে কম বয়সীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিতর্ক চলছে, যা দেশ থেকে অভিবাসনের কারণ হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালে যুদ্ধবিরতি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে যদি ইউক্রেন সীমান্তবর্তী কিছু অঞ্চলে ছাড় দেয়, তাহলে পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। পাশাপাশি এটি একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া পশ্চিমা দেশগুলো ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করতে আগ্রহী নয়। ফলে ইউক্রেনে সেনা মোতায়েনে পশ্চিমা বিশ্বে মতবিরোধ থাকায় শান্তি চুক্তি সহজে বাস্তবায়িত হবে না।

যদি ২০২৫ সালে যুদ্ধবিরতি হয়, তবে তা সম্ভবত অস্থায়ী হবে। এ অবস্থায় যুদ্ধবিরতি না হওয়া পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন (যা ২০২৪ ও ২০২৩ সালে হওয়ার কথা ছিল) স্থগিত থাকতে পারে।

যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চারটি সম্ভাব্য পথ

বিশ্লেষকরা চারটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে আলোচনা করছেন:
১. যুদ্ধের ধীর গতির অব্যাহত থাকা: ফলে দুই পক্ষই তাদের সামর্থ্য যাচাই করে যাবে।
২. অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি: ফলে সামনের যুদ্ধে শক্তি পুনর্গঠনের জন্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
৩. ইউরোপীয় সহায়তা বৃদ্ধি: যা রাশিয়াকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির সীমারেখায় ফেরাতে সহায়তা করবে। তবে এটি যুদ্ধের বিস্তৃতি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
৪. ইউক্রেনের পরাজয়: এতে ইউক্রেন রাশিয়ার শর্তে সমঝোতা করতে বাধ্য হবে। যেমন সরকার পরিবর্তন, নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা। এটি ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি।

বিশ্ব রাজনীতির প্রভাব

রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষক জন লফের মতে, বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন।

এদিকে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে চীন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তি বাড়ানোর সুযোগ পাবে। এদিকে ভুলক্রমে রাশিয়া ইউক্রেনে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিলে বিশ্বমঞ্চে চীনের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

ইউক্রেনের বর্তমান অবস্থান

যুদ্ধ এখনো জটিল। একদিকে রাশিয়া তার মূল লক্ষ্য, ন্যাটো সম্প্রসারণ ঠেকানো অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে ইউক্রেনও রুশ অগ্রগতি থামাতে ও দখলকৃত এলাকা পুনরুদ্ধারে পুরোপুরি সফল হয়নি। এমনকি এখনো ডনবাস, ক্রিমিয়া এবং অন্যান্য অঞ্চল রাশিয়ার দখলে রয়ে গেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের জনগণের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, কেন তারা একা ইউরোপের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক ভারসাম্য রক্ষায় লড়াই করছে। এদিকে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দেশের জন্য এর পরিণতি কী হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

আমাদের ফলো করুন