মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর অবরোধের কারণে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর শিশুরা খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটে পড়েছে। ফলে তারা অপুষ্টি ও নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ত্রাণকর্মীরা।
২০২১ সালে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে সংঘাত, বিমান হামলা, গ্রাম ধ্বংস এবং গোলাগুলির কারণে লাখো মানুষ পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। স্থিতিশীল আশ্রয় ও খাদ্যের অভাব তাদের দুর্দশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিন বছর ধরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকা সাগাইং অঞ্চলের ইয়িনমাবিন টাউনশিপের এক নারী জানান, তার দুই সন্তান অপুষ্টিতে ভুগছে। আমরা ভাঙা চাল, সবজি, মাছের পেস্ট ও আমলকী দিয়ে তৈরি সাধারণ খাবার খাই। এ ধরনের খাবারই শিশুদের জন্য প্রাপ্য।
তিনি আরও জানান, তার সন্তানরা অপুষ্টির কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ছে, তাদের শরীর দুর্বল ও পাতলা হয়ে গেছে এবং তারা পেশির জড়তা অনুভব করছে।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জানিয়েছে, মিয়ানমারে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই শিশু। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬০ লাখ শিশু ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটে রয়েছে।
রাখাইন রাজ্যের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে অবস্থানরত শিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ম্রাউক-উ ইয়ুথস অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য। তিনি জানান, কিছু শিবিরে কোন খাদ্যই নেই। কিছু পরিবারে পাঁচ সদস্যের মধ্যে শুধু শিশুদেরই খাওয়ানো হয়। মা-দের খাবার জোটে না। কিন্তু এই খাবারগুলো পুষ্টিগুণে খুবই কম। ফলে শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।
মিয়ানমারের পূর্বাঞ্চলের ক্যাহ ও দক্ষিণ শান রাজ্যের উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতেও একই পরিস্থিতি। এক ধাত্রী জানান, পাঁচ বছরের নিচে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বয়স্করা অপুষ্টির শিকার। গর্ভবতী নারীরা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন, যা ভ্রূণের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
অপুষ্টি শিশুর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে বলে জানান একজন চিকিৎসক। তিনি বলেন, অপুষ্টির কারণে হাড়ের বিকৃতি, রিকেটসসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। এটি একটি ভয়াবহ সমস্যা। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে শিশু মৃত্যুর হার বাড়বে।
এদিকে অঞ্চলভেদে কিছু খাদ্য ও নগদ সহায়তা দেওয়া হলেও, সাগাইং অঞ্চলে প্রায় ৭০ শতাংশ শিশু প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত। আউংন্যা পিয়েট টাইন হটং ত্রাণ সংস্থার প্রধান ফু পুইন্ট ওয়ে জানান, গ্রামীণ এলাকায় অনেক নবজাতক সময়মতো টিকা পাচ্ছে না।
ইউনিসেফের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারে এক মিলিয়নের বেশি শিশু প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত। শহরের কাছাকাছি কিছু এলাকায় টিকা পাওয়া সম্ভব হলেও গ্রামীণ এলাকায় শিশুদের টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে মিয়ানমারের পাল্টা সরকার ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’-এর নারী, যুব ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী নাও সুসানা হ্লা হ্লা সো জানিয়েছেন, কিছু এলাকায় নারীদের ও শিশুদের জন্য খাদ্য সহায়তা এবং নতুন মায়েদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
তবে সামরিক অবরোধ, খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট, এবং টিকাদান কার্যক্রম স্থগিত থাকায় মিয়ানমারের শিশুরা অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সূত্র: রেডিও ফ্রি এশিয়া (আরএফএ)







