যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে গাজার বাসিন্দাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে?

যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে গাজার বাসিন্দাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে?
যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে গাজার বাসিন্দাদের জন্য কি অপেক্ষা করছে? ছবি : সংগৃহীত

যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর ৪৭০ দিনের সহিংসতার অবসানের মাধ্যমে আজ রবিবার সকাল থেকে গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা জেগে উঠলেন বোমাবর্ষণমুক্ত এক নতুন দিনের প্রত্যাশায়। ইসরায়েলের বোমাবর্ষণ ও প্রাণঘাতী হামলার অবসানের মধ্য দিয়ে এই দিনটি গাজাবাসীদের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

কী হতে যাচ্ছে আজ সারাদিন

সকাল ৮:৩০: শান্তি প্রতিষ্ঠার শুরু

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আজ সকাল ৮.৩০ থেকে ইসরায়েলি সেনারা জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যাবে। পাশাপাশি আরও নতুন কিছু বিধান কার্যকর হবে।

বিধানগুলো হলো:

১. সেনা প্রত্যাহার

ইসরায়েলি সেনারা রাফা এবং উত্তর গাজার জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে গিয়ে সীমান্তের কাছাকাছি ৭০০ মিটার দূরে অবস্থান করবে। কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এই দূরত্ব ১১০০ মিটারে বাড়ানো হবে।

২. বিমান চলাচল বন্ধ

ফিলিস্তিনের আকাশে ইসরায়েলি সামরিক বিমান চলাচল ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ থাকবে।

৩. বাসিন্দাদের প্রত্যাবর্তন

রাফা শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় বাসিন্দাদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় এবং দক্ষিণ থেকে উত্তরে গমনকারী বাসিন্দাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

৪. মানবিক সহায়তা

প্রতিদিন ৬০০টি ট্রাক গাজায় মানবিক সহায়তা সরবরাহ করবে। এর মধ্যে খাদ্যদ্রব্য, লজিস্টিক উপকরণ এবং জরুরি ত্রাণসামগ্রী থাকবে।

বিকেল ৪:০০: বন্দি বিনিময়

চুক্তির অংশ হিসেবে আজ বিকেল ৪.০০ থেকে বন্দি বিনিময় কার্যকর করা হবে।

এতে ফিলিস্তিনি পক্ষ ৩ জন ইসরায়েলি বন্দিকে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের কাছে হস্তান্তর করবে। বিনিময়ে ইসরায়েল ৯০ জন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে। বন্দিদের মুক্তি আশকেলন এবং বেইত নিয়ার কারাগার থেকে সম্পন্ন হবে।

চুক্তিটি তিন ধাপে বাস্তবায়ন

গাজায় যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময়ের চুক্তি তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন হবে। প্রতিটি ধাপের সময়সীমা ৪২ দিন। এই চুক্তির মাধ্যমে মানবিক সংকট নিরসনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হবে।

প্রথম ধাপ:

১. সামরিক কার্যক্রম স্থগিত ও প্রাথমিক বন্দি বিনিময়

প্রথম ধাপে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।

২. ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার

ইসরায়েলি সেনারা জনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যাবে।

৩. রাফা সীমান্ত খুলে দেওয়া

চুক্তির প্রথম দিন থেকেই রাফা সীমান্ত দিয়ে মানবিক সহায়তা প্রবাহ শুরু হবে। সপ্তম দিন থেকে রোগীদের স্থানান্তরের সুযোগ দেওয়া হবে।

৪. বন্দি বিনিময়

প্রথম ধাপে গাজায় বন্দি থাকা ৩৩ জন ইসরায়েলি (জীবিত ও মৃত) মুক্তি দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে কয়েক ধাপে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হবে। তবে ফিলিস্তিনি বন্দিদের সংখ্যা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী মুক্তিপ্রাপ্তদের সংখ্যা হতে পারে ১,৭৩৭ থেকে ১,৯৭৭ জন।

দ্বিতীয় ধাপ: সম্পূর্ণ শান্তি ও সেনা প্রত্যাহার

১. দ্বিতীয় ধাপে ইসরায়েলি সেনারা পুরোপুরি গাজা থেকে সরে যাবে।

২. শান্তি বজায় রাখা

প্রথম ধাপের সব শর্ত দ্বিতীয় ধাপেও বহাল থাকবে।

৩. অতিরিক্ত বন্দি বিনিময়

এ ধাপে আরও বন্দি বিনিময় ও সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।

৪. আন্তর্জাতিক উদ্যোগ

মিশর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় ধাপের শর্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

তৃতীয় ধাপ: গাজার পুনর্গঠন

তৃতীয় ধাপে গাজা পুনর্গঠনের কাজ শুরু হবে।

১. পুনর্গঠন পরিকল্পনা

গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম ৩ থেকে ৫ বছরের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।

২. দেহাবশেষ বিনিময়

উভয় পক্ষের মধ্যে মৃতদেহ ও দেহাবশেষ বিনিময় হবে।

৩. সীমান্ত উন্মুক্ত করা

সব সীমান্ত খুলে দিয়ে মানুষের চলাচল এবং পণ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।

উল্লেখ্য, ইসরায়েল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এতে ১ লাখ ৫৭ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি হতাহত হন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১১ হাজারের বেশি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৩ সালের ২১ নভেম্বর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। তাদের বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

আমাদের ফলো করুন